চুল পড়ার কারণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

 

Written by Dr.Md.Redwanul Huq (Masum)
Saturday, 16 August 2014 20:16

চুল প্রতিদিনই পড়ে, তবে হ্যাঁ, ১০০-১২৫ টার বেশী পড়া অবশ্যই সমস্যা, তবে তার সমাধানও আছে। এ বিষয়েই আপনাদের সঙ্গে আলাপ করছি, সাথে থাকুন।

চুল পড়ার কারণ

  • শতকরা ৯৫ ভাগ চুল পড়ার কারণ জিনগত/ বংশগত ।এ কারণে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেদের মাথার মাঝখানের ও কপালের দুই পাশের এবং মেয়েদের মাথার উপরিভাগের ওদু’পাশের চুল পাতলা হয়ে যায়।
  • খুস্কি তো চুলের বিশ্বস্ত শত্রু, চুল তো সে ফেলবেই।
  • অতিরিক্ত শ্যাম্পু করা, স্টাইল করা ও রঙ করা চুলের জন্য ক্ষতিকর।
  • থাইরয়েড হরমোনজনিত বালিভারের সমস্যাজনিত কারণেও চুল পড়তে পারে।
  • কেমোথেরাপি নিলে চুল পড়ে যায়।
  • মহিলাদের মেনোপজ হলে অর্থাৎ মাসিক বন্ধ হয়ে গেলে চুল পড়ে।
  • অতিরিক্ত ডায়েট কন্ট্রোল করছেন ? সাবধান! এতেও কিন্তু চুল পড়ে।
  • ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক জনিত ইনফেকশনের কারণে চুল কমে
  • চুলের অযত্ন হলে সে কি আর থাকে মাথায়?
  • কেমিক্যাল ব্যবহারেও চুল পড়ে।
  • মানসিক চাপ চুলের উপরেও চাপ তৈরি করে
  • পরিবারের কারো রিউমাটয়েড আথ্রাটিস, হাপানি, প্যারনেসিয়াস অ্যানিমিয়া ইত্যাদি রোগ থাকলে সেই পরিবারের লোকজনের চুল পড়া রোগও হতে পারে।
  • রক্তস্বল্পতা, যেমনঃ আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা চুল পড়ার কারণ ।
  • বিভিন্ন রকমের রোগ যেমনঃ ডায়াবেটিস, অটোইমিউন রোগ যেমন- লুপাস, মূত্রনালীর প্রদাহ, পলিসিস্‌টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম ইত্যাদি চুল পড়ার কারণ।
  • নানা ধরনের ওষুধ যেমনঃ জন্মনিয়ন্ত্রিন পিল, এনটি ডিপ্রেসেন্ট, বিটা ব্লকার, কিছু এনএসএআইডি, ইমিউনো সাপ্রেসিভ এজেন্টস ইত্যাদি সেবন করলে এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে চুল পড়ে যেতে পারে।
  • হঠাৎ করে ওজন কমে যাচ্ছে ? চুলও কমে যেতে পারে।
  • হজমের সমস্যায়ও চুল পড়তে দেখা যায়।
  • প্রয়োজন মতো না ঘুমালে কিন্তু মাথায় চুল খুঁজে নাও পেতে পারেন।
  • গর্ভাবস্থায় চুল পড়তে পারে।
  • বড় কোন অপারেশনের পর চুল পড়তে পারে।
  • ভিটামিন ই কম খেলেও চুল কমতে পারে
  • অতি মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ খাবেন না, চুল কিন্তু পড়তে পারে।
  • অতি কর্মব্যস্ততা চুল পড়ার অন্যতম কারণ।
  • গরমে চুল পড়া বেড়ে যায়।

কিছু ভুল যা আমরা ঠিক বলেই জানিঃ

১) লম্বা সময় টুপি পড়ে থাকলে চুল পড়া বাড়ে।
২) শ্যাম্পু করলে চুল পড়ে।
৩) লম্বা চুল চুলের গোড়ায় বাড়তি চাপ প্রয়োগ করে।
৪) কালার বা কন্ডিশনিংয়ের কারণে চুল পড়ে।
৫) ম্যাসাজিং করে চুল পড়া বন্ধ করা যায়।
এগুলো কোনটাই সঠিক নয়।
চুল পড়া

চুল পড়া প্রতিরোধ করার উপায়ঃ

হ্যাঁ, অনেক ক্ষেত্রেই চুল পড়া প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে সে জন্যে আপনাকে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবেঃ

  • চুলের গোড়ায় যেন পানি না জমে।
  • চুল এর গোড়াঘেমে গেলে তা তাড়াতাড়িশুকিয়ে ফেলুন।
  • আপনার হেয়ার ড্রায়ার টি কুল ও লো সেটিংস এ রাখুন এবং ফ্ল্যাট আয়রন কম ব্যবহার করুন।
  • একদিন বা দুই দিন পর পরমাথায় শ্যাম্পু দিন।
  • আপনার চুলকে তার স্বাভাবিক রঙের চেয়ে এক বা দুই শেড এর বেশী রঙ করবেন না।
  • নিজের পরিষ্কার ও শুকনো গামছা বাতোয়ালে দিয়ে মাথা মুছবেন।
  • এক বা দুই সপ্তাহ পরপরবা কমপক্ষে মাসে একবার নিজের বালিশের কভার ভালভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিন।
  • পরিষ্কার চিড়নী দিয়ে চুল আচড়াবেন, তবে জোরে জোরে নয়।
  • ভেজা চুল বাঁধবেন না, অাঁচড়াবেন না, বেশি টানাটানিও করবেন না।
  • খুব টেনে চুল বাঁধাও ভাল নয়।
  • প্রতিদিন শাক-সবজি, মাছ, ফল, দুধ, ডিম, দই, পনির, ডালইত্যাদি যথেষ্ট পরিমাণে খাবেন, খেয়াল রাখবেন যেন প্রতিদিনের খাবারে জিঙ্ক, ভিটামিন বি, ভিটামিন ডি, ফোলেট, ক্যালসিয়াম ও আয়রন থাকে।
  • দোকানে চুল কাটালে বাসায় এসে শ্যাম্পু করবেন কিন্তু
  • যাদের মাথা শুষ্ক তারা মাথায় কন্ডিশনার ব্যবহার করলে ভালহয়।
  • বৃষ্টিতে মাথা ভেজাবেন না।
  • রাতেপ্রয়োজন মতো ঘুমাবেন।
  • ঐ সব প্রসাধনী থেকে দূরে থাকুন যা আপনার মাথায় অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন করে।

চুল পড়া

চুল পড়ার চিকিৎসাঃ

চুল পড়ার চিকিৎসা আছে, অবশ্যই আছে, তবে চিকিৎসার আগে কারণটা নির্ণয় করতে হবে। নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা গেলে সে অনুযায়ী চিকিৎসা করাতেহবে। মনে রাখতে হবে যে, চুল পড়া প্রতিরোধে চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী হয়ে থাকে। আসুন জেনে নেই চুল পড়ার কি চিকিৎসা –

  • চুল পড়া রোধ করতে এবং পুনরায় চুল গজাতে5% মিনোক্সিডিল (যা ৫% মিন্টপ টপিকাল লোশন বা সল্যুশন নামেবাজারে পাওয়া যায়)খুবই ভাল একটি ওষুধযা ৯০% ক্ষেত্রেই উপকারী। এই ওষুধ দিনে দুবারব্যবহার করতে হয়।
  • ফাংগাসের কারণে চুল পড়লে অ্যান্টিফাংগাল ক্যাপসুল (যেমনঃ ফ্লুকোনাজল) খেতে হবে আর মাথায় অ্যান্টিফাংগাল শ্যাম্পু(যেমনঃ কিটোকোনাজল যা ডানসেল / নিজোরাল / সিলেক্ট প্লাস ইত্যাদি নামে পাওয়া যায়) সপ্তাহে ২ / ৩ বার দিতে হবে।
  • ট্যাবলেট. ফিনেসটেরাইড ৫ মিঃ গ্রাঃ (যা প্রোনর / প্রসফিন ইত্যাদিনামে পাওয়া যায়) প্রতিরাতে একটাখেলে চুল পড়া অনেকাংশে প্রতিরোধ হয়।এটি প্রায় ৮৮% পুরুষের ক্ষেত্রে চুল পড়ার গতি কমাতে এবং প্রায় ৬৬% পুরুষের ক্ষেত্রে পুনরায় চুল গজাতে সাহায্য করে, তবে গর্ভধারণ করার ক্ষমতা বাবয়স আছে এমন মহিলারাএ ওষুধ সেবন করবেন না।
  • থাইরয়েড হরমোনজনিত সমস্যা, লিভারের সমস্যা, ডায়াবেটিস, অটোইমিউন রোগ, আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা, মূত্রনালীর প্রদাহ, পলিসিস্‌টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম ইত্যাদি রোগের কারণে যদি চুল পড়ে তাহলে রোগের চিকিৎসা করলে চুল পড়া কমে যাবে।
  • দেহের প্রদাহ জনিত কারণে বা অটো ইমিউন রোগে চুল পড়লে স্কাল্পে (মাথার চামড়ায়) করটিকোস্টেরয়েড ইনজেকশন দিতে হবে।
  • চিড়নী, ব্রাশ ও অন্যান্য হাত দিয়ে ধরা যায় এমন ডিভাইস যা আলো নিঃসরণ করে, চুলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
  • শল্য চিকিৎসার নানা পদ্ধতিঃ
  1. হেয়ার ট্রান্সপ্লান্টেসন (চুল প্রতিস্থাপন),যাতে মাথার পেছনের অংশ থেকে চুল নিয়েসামনেরঅংশে বসিয়ে দেয়া হয়।
  2. স্কাল্প ফ্ল্যাপ্স, যাতে অপারেশনের মাধ্যমে টাক অংশের চামড়া ফেলে দিয়েচুলযুক্ত অংশ সে জায়গায় জোড়া লাগানো হয়।
  3. স্কাল্প রিডাকশন, যাতেমাথার টাকের অংশের চামড়া কেটে কমিয়ে ফেলা হয়।

যবনিকা –

টাক হওয়ার চিন্তায় মাথায় টাক না ফেলে আজ থেকে সতর্ক হয়ে যান, যত্ন নিন আপনার চুলের, প্রয়োজনে চিকিৎসা গ্রহণ করুন, আর যেন অতিরিক্ত হারে না পড়ে আপনার মূল্যবান চুল।

ফেইসবুকে আমাকে আপনার রোগ সম্পর্কে জানাতে লিখুন এখানেঃ

www.facebook.com/Medicalforallnet